
রেমবো ত্রিপুরা, থানচি (বান্দরবান) প্রতিনিধি:
বান্দরবান পার্বত্য জেলায় বসবাসরত ত্রিপুরা সম্প্রদায় আজ এক গভীর সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী, সংহত ও সংস্কৃতিবান এই জনগোষ্ঠী বর্তমানে নানা অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও বিভাজনের কারণে পিছিয়ে পড়ছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে—একতার অভাব, মতপার্থক্য, দলাদলি ও বিবাদ কলহ।
ত্রিপুরা সমাজের ভেতরে ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে কেউ ব্যাপ্টিস্ট, কেউ ক্যাথলিক, কেউ আবার অন্য মন্ডলীর অনুসারী—এই পার্থক্যকে কেন্দ্র করেও একে অপরের প্রতি অসহিষ্ণুতা ও মন্ডলীগত দণ্ড আরোপ সমাজকে আরও ভাঙনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ধর্ম যেখানে মানুষের নৈতিকতা ও মানবিকতার বিকাশ ঘটানোর কথা, সেখানে মন্ডলীর মন্ডলীতেও আজ বিভেদের হাতিয়ার হয়ে উঠছে—এটি নিঃসন্দেহে আত্মঘাতী।
শুধু ধর্মীয় বিভাজনই নয়, সামাজিক কাঠামোর ভেতরেও রয়েছে তীব্র মতবিরোধ। পাড়ার সঙ্গে পাড়ার দ্বন্দ্ব, আবার একই পাড়ার ভেতরে কারবারি (নেতৃত্ব) নিয়ে বিভক্তি সমাজকে নেতৃত্বশূন্য ও দিকনির্দেশনাহীন করে তুলছে। এর ফলে উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে এবং তরুণ প্রজন্ম হারাচ্ছে আদর্শ ও অনুপ্রেরণা।
আরও একটি বড় বাস্তবতা হলো—শিক্ষা ও পেশাগত ক্ষেত্রে ত্রিপুরা সমাজের পিছিয়ে পড়া। ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, আইনজীবী কিংবা সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব আজও হাতে গোনা। শিক্ষা, প্রতিযোগিতা ও পেশাগত প্রস্তুতির অভাব সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে আরও প্রান্তিক করে তুলছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমাজে ক্রমবর্ধমান মদ্যপানের প্রবণতা। অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীন মদ্যপান শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো পরিবার ও সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই মদের মাধ্যমেই নষ্ট হচ্ছে নৈতিকতা, ভেঙে পড়ছে পারিবারিক বন্ধন, বাড়ছে সহিংসতা ও অপরাধ। বলা যায়, মদ আজ ত্রিপুরা সমাজে ধর্মীয় অবক্ষয় ও সামাজিক বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নীরব থাকা মানেই আত্মবিনাশকে মেনে নেওয়া। এখনই সময়—ত্রিপুরা সমাজকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। ত্রিপুরা জাতির হিসেবে পাড়া বা মন্ডলীর ঊর্ধ্বে উঠে নিজস্ব পরিচয় ও স্বার্থ রক্ষায় এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, তরুণদের মেধা ও নেতৃত্ব বিকাশে বিনিয়োগ করতে হবে। সামাজিক নেতৃত্বকে হতে হবে স্বচ্ছ, ঐক্যকামী ও দূরদর্শী।
একই সঙ্গে অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীন মদ্যপানের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পরিবার, মন্ডলীর, সমাজপতি ও শিক্ষিত শ্রেণিকে এগিয়ে এসে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। মনে রাখতে হবে—একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নৈতিক শক্তি ও ঐক্যের উপর।
পরিশেষে বলা যায়, ত্রিপুরা সমাজ আজ যে সংকটে রয়েছে, তা অতিক্রম করা অসম্ভব কিছুই নয়। প্রয়োজন শুধু আত্মসমালোচনা, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ। এখনই যদি জাগ্রত না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের এই বিভক্তি ও অবক্ষয়ের জন্য ক্ষমা করবে না। এখনই সময়—একতার, শিক্ষার এবং আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের। আসুন ঐক্যবদ্ধ হয়, ব্যক্তির চেয়ে সমাজকে, সমাজের চেয়ে জাতিকে প্রাধান্য দেয়ার আরম্ভ করি।