
আব্দুল্লাহ আল মামুন হরিনাকুন্ডু সংবাদদাতা ঃ ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার অন্তর্গত জোড়াদহ একটি বর্ধিষ্ণু জনপদ। হরিণাকুণ্ডু সদর থেকে একটি পাকা রাস্তা সাতব্রিজ ,হরিশপুর, ভানীপুর (ভবানীপুর), বাকুয়া (বাকচুয়া) ও জুটাপট্টি (জোড়াদহ) বাজার হয়ে সোজা উত্তরে জোড়াদহ চলে গেছে। ঝিনাইদহের মধ্যে জোড়াদহ অন্যতম একটি বিশেষ স্থান। এখানে একদা স্থাপিত হয়েছিল একটি বিশাল নীলকুঠি। ইহা জোড়াদহ নীল কনসার্ন নামে পরিচিত ছিল। ১৮১৫-১৬ সালের মধ্যে জোড়াদহ নীলকুঠি স্থাপিত হয়। শ্রোতস্বিনী ও নাব্য কুমার নদীর দক্ষিণ তীরে নির্মিত হয় এ প্রতিষ্ঠান। নীলকুঠি স্থাপনের পর থেকে এ স্থানের উন্নতি শুরু হয়। জোড়াদহ, ভানীপুর, সোহাগপুর, যোলদাড়ি (আলমডাঙ্গা উপজেলা) প্রভৃতি কুঠির সমন্বয়ে জোড়াদহ নীল কনসার্ন গড়ে উঠেছিল। ইহা জেমস শেরিফ (James Sheriff) নামক একজন ইউরোপীয় নীলকরের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। তিনি নিজে এ কনসার্ন পরিচালনা করতেন। ১৮৫০-৬০ সালের মধ্যে জোড়াদহ কুঠির আওতায় ৯,৪৫০ বিঘা জমিতে নীলচাষ হতো। উৎপন্ন নীলের পরিমাণ ছিল ৬০০ মন। উৎপাদিত নীলের দাম ছিল ১,৫০,০০০ টাকা।
মি. জে. বি. ম্যাকনেয়ার সাহেব ছিলেন জোড়াদহ নীলকুঠির ম্যানেজার। চুয়াডাঙ্গা জেলার পূর্ব সীমা নবগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত সিন্দুরিয়া নীল কনসার্নের ম্যানেজারও ছিলেন তিনি। নীলকরের ম্যানেজার ম্যাকনেয়ার ছিলেন অত্যন্ত দাপুটে ও অত্যাচারী। একটি নীল কনসার্নের সার্বিক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান ছিলেন ম্যানেজার। তাকে কার্যাধ্যক্ষও বলা হতো। কনসার্নের সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তিনি মালিককে অবহিত করতেন এবং কলকাতায় এজেন্টদের নিকট মাসিক ব্যয়ের সারসংক্ষেপ, গুদাম ও নীলবীজ সরবরাহ পরিস্থিতি এবং পরবর্তী বছরে
নীলকরেরা ছিলেন পুঁজিপতি তালুকদার। সে জন্য তাদের তালুকের মধ্যে খাজনা বৃদ্ধি করে নীলচাষের ক্ষতি পূরণের ব্যবস্থা করত। কিন্তু চাষিরা সংঘবদ্ধভাবে বর্ধিত হারে খাজনা না দেওয়ার আন্দোলনে নামে। প্রথম খাজনা আন্দোলনের সূচনা হয় জোড়াদহ নীল কনসার্নে। পূর্বেই বলেছি এ কনসার্নটি ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু থানার উত্তরে কুমার নদীর তীরে অবস্থিত। ১৮৬০ সালে এ কনসার্নের আওতাভুক্ত চাষিরা নীলকরদের দাবিকৃত বর্ধিত খাজনা দিতে অস্বীকার করে। পরবর্তীতে অন্যান্য কুঠিতেও খাজনা না দেওয়ার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। রায়তেরা জানতো যে, নতুন আইন প্রবর্তন ব্যতিরেকে বর্ধিত খাজনা আদায় করতে পারবে না নীলকররা। তাই তারা খাজনা প্রদান থেকে বিরত থাকে।
১৮৬০ সালে নীলচাষ জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা বিলোপের মাধ্যমে প্রথম নীল আন্দোলন প্রশমিত হয়। সেই সাথে পরিমার্জিত হারে খাজনা না দেওয়ার আন্দোলনও প্রশমিত হয়। উভয় আন্দোলনে কৃষকরা সফল হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, জোড়াদহ নীলকুঠির ম্যানেজার জে. বি. ম্যাকনেয়ার অত্যাচারী হলেও এ কুঠির অধিকারী জেমস শেরিফ (James Sheriff) ছিলেন ভদ্রজন ও দানশীল ব্যক্তি।
তাই প্রচেষ্টা ও অর্থানুকূল্যে জোড়াদহ উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯৮ সালে। নিকটবর্তী অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয় পরবর্তীতে আরও উন্নত হয়ে এ অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে এবং কুঠিয়াল জেমস শেরিফ-এর কৃতিত্ব ঘোষণা করছে।